Spread the love

একজন পরিচালক, একজন গল্পকার, একজন শিল্পী—আর এক অনন্ত অসমাপ্ত সংলাপ

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু পরিচালক হিসেবে লেখা থাকে না, তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক। ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই বিরল শিল্পীদের একজন। তাঁর সিনেমায় ছিল সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন, মানুষের একাকিত্ব, প্রেম, পরিবার, নারী-মন, আত্মপরিচয় এবং সমাজের অদৃশ্য চাপ। খুব বেশি দিন তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন না—মাত্র ৪৯ বছর। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, বৈচিত্র্য এবং প্রভাব আজও বিস্ময় জাগায়।

১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্ম ঋতুপর্ণ ঘোষের। তাঁর বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী। ছোটবেলা থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির আবহে বেড়ে ওঠেন ঋতুপর্ণ। অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় ক্রিয়েটিভ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ করার অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্রের দৃশ্য নির্মাণ, নন্দনবোধ এবং সংলাপের শৈলীতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

‘হীরের আংটি’ থেকে পথচলা

১৯৯২ সালে শিশুসাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে ‘হীরের আংটি’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ছবিটি ছিল তুলনামূলকভাবে সরল ও শিশু-কেন্দ্রিক। কিন্তু দ্বিতীয় ছবিতেই বদলে গেল বাংলা সিনেমার দৃশ্যপট।

১৯৯৪ সালে মুক্তি পেল ‘উনিশে এপ্রিল’। মা ও মেয়ের সম্পর্কের জটিলতা, অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি এবং ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন ভাষা তৈরি করল। ছবিটি ১৯৯৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বর্ণকমল লাভ করে। একই ছবির জন্য দেবশ্রী রায় পান শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার।

এই সাফল্যের পর ঋতুপর্ণ ঘোষ আর শুধুমাত্র একজন পরিচালক রইলেন না—তিনি হয়ে উঠলেন বাংলা মধ্যবিত্ত জীবনের একজন অসাধারণ পর্যবেক্ষক।

সম্পর্কের গল্পই হয়ে উঠল তাঁর সিনেমার প্রধান চরিত্র

‘দহন’, ‘বাড়িওয়ালি’, ‘অসুখ’, ‘উৎসব’, ‘তিতলি’, ‘শুভ মহরৎ’—প্রতিটি ছবিতেই তিনি মানুষের ভেতরের গল্প খুঁজেছেন।

‘দহন’-এ উঠে এসেছিল যৌন হেনস্তা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার নির্মম বাস্তবতা।
‘বাড়িওয়ালি’-তে নিঃসঙ্গতা এবং অপূর্ণতার যন্ত্রণা।
‘অসুখ’-এ অসুস্থতা, অর্থ এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন।
‘উৎসব’-এ দুর্গাপুজোর আবহে একটি পরিবারের ভাঙন ও পুনর্মিলনের গল্প।
আর ‘শুভ মহরৎ’-এ আগাথা ক্রিস্টির রহস্যকাহিনির ছায়ায় নির্মাণ করেন এক বাঙালি থ্রিলার।

তাঁর সিনেমার বিশেষত্ব ছিল—বড় ঘটনা নয়, ছোট ছোট মুহূর্তের মধ্যেই তিনি নাটক খুঁজে পেতেন।

রবীন্দ্রনাথ থেকে শরৎচন্দ্র—সাহিত্য ও সিনেমার সেতুবন্ধন

ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমায় বাংলা সাহিত্যের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ অবলম্বনে নির্মিত একই নামের চলচ্চিত্রে তিনি উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক কাঠামো, নারী-পুরুষের সম্পর্ক এবং বিধবা নারীর অবস্থানকে আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষায় তুলে ধরেন।

পরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘নৌকাডুবি’ অবলম্বনে তৈরি করেন একই নামের ছবি। সাহিত্যকে তিনি কখনও কেবল গল্প হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং সাহিত্যের অন্তর্নিহিত আবেগ ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে নিজের চলচ্চিত্রভাষায় পুনর্নির্মাণ করেছেন।

বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে

ঋতুপর্ণ ঘোষের চলচ্চিত্র একের পর এক জাতীয় পুরস্কার অর্জন করতে থাকে। তাঁর ছবির উপস্থিতি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও বাংলা সিনেমাকে নতুন করে পরিচিত করে।

‘চোখের বালি’, ‘দোসর’, ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’, ‘আবহমান’, ‘শব চরিত্র কাল্পনিক’-সহ একাধিক ছবি দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়। ‘বাড়িওয়ালি’ বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে NETPAC Award লাভ করে। ‘আবহমান’-এর জন্য ২০১০ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ শ্রেষ্ঠ পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। একই ছবির জন্য বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্মের জাতীয় পুরস্কারও আসে।

তাঁর চলচ্চিত্রগুলির মাধ্যমে বাংলা সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দর্শকদের কাছেও নতুনভাবে পৌঁছেছিল।

‘রেনকোট’ থেকে ‘দ্য লাস্ট লিয়ার’—হিন্দি ছবিতেও স্বাক্ষর

বাংলার পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রেও নিজের স্বতন্ত্র পরিচালনাশৈলী প্রতিষ্ঠা করেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। অজয় দেবগন ও ঐশ্বর্য রাই অভিনীত ‘Raincoat’ তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য হিন্দি ছবি। সীমিত পরিসর, দু’জন মানুষের কথোপকথন এবং আবেগের স্তর—এই ছবিতেও তাঁর নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা স্পষ্ট।

অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘The Last Lear’ তাঁকে আরও বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। ছবিটি ২০০৮ সালে ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্ম হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।

অভিনেতা ঋতুপর্ণ

পরিচালনার পাশাপাশি জীবনের শেষ পর্বে অভিনয়েও তিনি নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। তাঁর অভিনীত ও পরিচালিত ‘চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ’ ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ও শিল্পীসত্তার এক গভীর প্রকাশ। ছবিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ থেকে অনুপ্রাণিত হলেও এর কেন্দ্রে ছিল আত্মপরিচয়, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও নিজেকে নিজের মতো করে খুঁজে পাওয়ার প্রশ্ন।

‘চিত্রাঙ্গদা’-র জন্য তিনি ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

ব্যক্তিসত্তা ও সাহসী অবস্থান

ঋতুপর্ণ ঘোষের শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর নিজের পরিচয় ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে নির্ভীক অবস্থান। ভারতীয় সমাজে যৌনতা, লিঙ্গপরিচয় ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে আলোচনা বহু বছর ধরে অস্বস্তিকর বলে বিবেচিত হয়েছে, ঋতুপর্ণ তাঁর কাজ ও প্রকাশ্য উপস্থিতির মাধ্যমে সেই আলোচনাকে সামনে নিয়ে আসেন।

তবে তাঁকে কেবল তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের নিরিখে বিচার করলে তাঁর শিল্পীসত্তার বিশালতাকে ছোট করে দেখা হয়। তাঁর মূল শক্তি ছিল মানুষকে বোঝার ক্ষমতা—মানুষের ভেতরের অপ্রকাশিত কথাগুলোকে সিনেমার পর্দায় তুলে ধরার ক্ষমতা।

শেষ অধ্যায়

ঋতুপর্ণ ঘোষের জীবন থেমে যায় অত্যন্ত অল্প বয়সে।

৩০ মে ২০১৩, কলকাতায় ৪৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। সমকালীন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর মৃত্যুকে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল; তিনি অগ্ন্যাশয়ের সমস্যাতেও ভুগছিলেন। তাঁর অকালপ্রয়াণ বাংলা চলচ্চিত্রে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে।

তাঁর শেষ দিকের কাজগুলির মধ্যে ‘চিত্রাঙ্গদা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র ‘সত্যান্বেষী’ তাঁর মৃত্যুর পর মুক্তি পায়।

২০১৩ থেকে ২০২৬—কেটে গেছে তেরো বছর, ঋতুপর্ণ এখনও প্রাসঙ্গিক

২০১৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে। ২০২৬ সালেও তাঁর সিনেমা নিয়ে আলোচনা থামেনি। বরং নতুন প্রজন্মের দর্শক ও চলচ্চিত্রকর্মীরা তাঁর কাজকে নতুন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করছেন।

আজকের OTT-নির্ভর সময়ে যখন গল্প বলার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখনও ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার সংলাপ, চরিত্র নির্মাণ, ক্যামেরার ব্যবহার, পোশাক, সেট, সংগীত এবং সর্বোপরি সম্পর্কের মনস্তত্ত্ব নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই—তিনি মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বড় ঘটনাকে দেখানোর চেয়ে ঘটনার পরে মানুষের মনের মধ্যে কী ঘটে, সেটি দেখাতে বেশি আগ্রহী ছিলেন।

একটি অসমাপ্ত অধ্যায়

মাত্র ২১ বছরের চলচ্চিত্রজীবনে ঋতুপর্ণ ঘোষ রেখে গেছেন এমন এক সৃষ্টিসম্ভার, যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়। তিনি দেখিয়েছিলেন, চলচ্চিত্র মানেই শুধু বিনোদন নয়; চলচ্চিত্র হতে পারে সম্পর্কের আয়না, সমাজের দলিল এবং মানুষের অন্তর্জগতের ভাষা।

আজ তিনি নেই। নেই তাঁর নতুন কোনো ছবির অপেক্ষা, নেই নতুন কোনো সংলাপ শোনার প্রত্যাশা। কিন্তু তাঁর সিনেমাগুলি এখনও কথা বলে।

৩১ আগস্ট ১৯৬৩ থেকে ৩০ মে ২০১৩—সময়ের হিসাবে মাত্র ৪৯ বছর।
কিন্তু শিল্পের হিসাবে ঋতুপর্ণ ঘোষের সময় এখনও শেষ হয়নি।

২০২৬-এর বাংলা চলচ্চিত্র যখন নতুন গল্প, নতুন ভাষা এবং নতুন দর্শকের সন্ধানে এগিয়ে চলেছে, তখনও বারবার ফিরে তাকাতে হয় সেই মানুষটির দিকে, যিনি একদিন ক্যামেরা হাতে বলেছিলেন—মানুষের সবচেয়ে বড় গল্পটি আসলে তার নিজের ভেতরেই লেখা থাকে।

ঋতুপর্ণ ঘোষ তাই শুধু একজন প্রবাদপ্রতিম পরিচালক নন; তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের এক দীর্ঘস্থায়ী অনুভব।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *