Spread the love

হিংসা, মাদক, যৌন হিংসা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে কড়া বিধি, ‘ইউ/এ’ সার্টিফিকেটে বয়সভিত্তিক নতুন বিভাজন

নয়াদিল্লি, ১৯ সেপ্টেম্বর: সিনেমার সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় একাধিক ক্ষেত্রে সংশোধিত নির্দেশিকা জারি করল কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা এই নির্দেশিকায় হিংসা, মাদক, ধূমপান, যৌন হিংসা, নারীকে হেয় করা, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়াতে পারে এমন বিষয়-সহ একাধিক বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধি বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য, চলচ্চিত্র যেন সমাজের মূল্যবোধ ও মানদণ্ডের প্রতি দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল থাকে। একইসঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতা যাতে অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা এবং দর্শকদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর বিনোদন নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে। সিনেমার নান্দনিক ও চলচ্চিত্রগত মানকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় বা এড়ানো সম্ভব এমন হিংসা, নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতার দৃশ্য দেখানো যাবে না। শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে এমন হিংসার ব্যবহারও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, যা দর্শকদের অসংবেদনশীল বা অমানবিক করে তুলতে পারে।

মদ্যপানকে উৎসাহিত করে এমন দৃশ্যের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। একইভাবে মাদকাসক্তিকে উৎসাহ দেওয়া বা তার যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তামাক বা ধূমপানের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে এমন দৃশ্যও নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

সিনেমায় মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, সেবন বা পাচার দেখানো হলে নির্দিষ্ট আইনি সতর্কবার্তা দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। নির্দেশিকায় নির্ধারিত বার্তাটি হল— “Illicit Narcotics Destroy Health and Guarantees Imprisonment. Say No to Drugs.”

অশ্লীল, অশোভনীয় বা অবমাননাকর বিষয়বস্তুর মাধ্যমে মানুষের সংবেদনশীলতায় আঘাত করা যাবে না। এমন দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ব্যবহার থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে নিম্নরুচির প্রবৃত্তিকে উসকে দিতে পারে।

নারীকে অবমাননা বা হেয় করে এমন দৃশ্য রাখার ক্ষেত্রেও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ বা অন্য কোনও ধরনের যৌন হিংসার দৃশ্য এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। কাহিনির সঙ্গে এমন ঘটনা সরাসরি যুক্ত থাকলে দৃশ্যটি যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত করতে হবে এবং ঘটনার কোনও বিস্তারিত বিবরণ বা দৃশ্যায়ন করা যাবে না।

যৌন বিকৃতি-সংক্রান্ত দৃশ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। গল্পের প্রয়োজনে এমন বিষয় দেখানো অপরিহার্য হলে তা ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার পাশাপাশি বিস্তারিত দৃশ্য দেখানো যাবে না।

কোনও জাতি, ধর্মীয় গোষ্ঠী বা অন্য কোনও সম্প্রদায়কে অবমাননা করে এমন বক্তব্য বা দৃশ্যও রাখা যাবে না। সাম্প্রদায়িকতা, অন্ধবিশ্বাস, বিজ্ঞানবিরোধী মনোভাব বা দেশবিরোধী মনোভাবকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়ও সার্টিফিকেশনের সময় বিবেচনায় রাখা হবে।

দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং বিদেশি রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও নির্দেশিকায় স্পষ্ট বিধান রয়েছে। জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে এমন দৃশ্য বা বক্তব্য, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানহানি এবং আদালত অবমাননার বিষয়ও সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় প্রতীক ও জাতীয় প্রতীক-সংক্রান্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘ইউ/এ’ সার্টিফিকেটে বয়সভিত্তিক নতুন বিভাজন

সংশোধিত নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শিশুদের বয়স অনুযায়ী ‘ইউ/এ’ সার্টিফিকেশনে আরও নির্দিষ্ট বিভাজন। কোনও ছবির বিষয়বস্তু দেখে বোর্ড মনে করলে যে শিশুর বয়স বিবেচনা করে বাবা-মা বা অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক ‘ইউ/এ’ মার্কার ব্যবহার করা যাবে।

ইউ/এ ৭+ — ৭ বছর বা তার বেশি বয়সি শিশুদের জন্য উপযুক্ত। ৭ বছরের কম বয়সিরা অভিভাবকের নির্দেশনায় দেখতে পারবে।

ইউ/এ ১৩+ — ১৩ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্য উপযুক্ত। ১৩ বছরের কম বয়সিরা অভিভাবকের নির্দেশনায় দেখতে পারবে।

ইউ/এ ১৬+ — ১৬ বছর বা তার বেশি বয়সিদের জন্য উপযুক্ত। ১৬ বছরের কম বয়সিরা অভিভাবকের নির্দেশনায় দেখতে পারবে।

এছাড়া কোনও ছবিকে সাধারণ দর্শকের পরিবর্তে নির্দিষ্ট পেশা বা বিশেষ শ্রেণির দর্শকদের জন্য উপযুক্ত বলে বোর্ড মনে করলে বিশেষ দর্শকদের জন্য প্রদর্শনের অনুমতিও দেওয়া যেতে পারে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনও সিনেমাকে তার সামগ্রিক প্রভাবের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। একইসঙ্গে ছবিতে যে সময়কাল দেখানো হয়েছে, সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশ ও মানুষের সমসাময়িক মানদণ্ডও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সিনেমার শিরোনাম নিয়েও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্ররোচনামূলক, অশালীন, আপত্তিকর অথবা নির্দেশিকার কোনও বিধি লঙ্ঘন করে এমন নাম ব্যবহার না করার বিষয়ে নিশ্চিত হতে বলা হয়েছে।

নতুন নির্দেশিকার ফলে একদিকে যেমন চলচ্চিত্রে হিংসা, মাদক, যৌন হিংসা ও বিদ্বেষমূলক বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায় আরও নির্দিষ্ট নিয়ম কার্যকর হবে, অন্যদিকে বয়সভিত্তিক ‘ইউ/এ’ শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে অভিভাবকদের জন্য দর্শক-নির্বাচনের ক্ষেত্রে আরও স্পষ্ট কাঠামো তৈরি হবে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *