Spread the love

নিজস্ব সংবাদদাতা | নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

প্রায় ৪৮০–৪৮৫ বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজা। ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নানা প্রাচীন রীতিকে কেন্দ্র করে আজও স্বতন্ত্র ঐতিহ্য বহন করে চলেছে নদিয়ার এই দুর্গোৎসব। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, অবিভক্ত বাংলার সময়ে এক আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সূত্র ধরেই এই পূজার সূচনা হয়েছিল। পূজাকে ঘিরে রয়েছে নস্কর বর্মন নামে এক সাধকের সাধনা, দেবীর হাতে শাঁখা পরানোর প্রথা এবং মহাষ্টমীর বিশেষ পুজো ও আরতির মতো নানা আকর্ষণীয় রীতি।
নদীপথে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা, তারপর পূজার সূচনা: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, অবিভক্ত বাংলার সময় বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের চলনবিল-সংলগ্ন এলাকায় এক জমিদার পরিবারের দুর্গাপূজার প্রতিমা নদীপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কথিত আছে, প্রতিমাটি নদিয়ার কৃষ্ণনগর অঞ্চল থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। যাত্রাপথে হঠাৎ প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাঝি নদিয়ার একটি গ্রামের ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে দেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রতিমা নিয়ে যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, দুর্গাপূজার নির্দিষ্ট তিথিও এগিয়ে আসছিল।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই প্রচলিত রয়েছে নস্কর বর্মন নামে এক সাধকের কাহিনি। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ওই গ্রামে একটি নিমগাছের কাছে তিনি সাধনা করতেন। কথিত আছে, দেবীর ইচ্ছাতেই সেই স্থানে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পূজার সূচনা করেন তিনি। পরবর্তীকালে সেই পূজাই স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, পূজার প্রাথমিক পর্যায়ে জমিদার পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হতো। সময়ের সঙ্গে জমিদারি ব্যবস্থা বিলুপ্ত হলেও পূজার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বর্তমানে এই প্রাচীন পূজাকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আবেগ, ভক্তি ও ঐতিহ্য আজও সমানভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
দেবীর হাতে শাঁখা পরানোর প্রথা ঘিরে রহস্যময় লোককথা : এই দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ দেবীর প্রতিমার হাতে শাঁখা পরানোর প্রাচীন রীতি। প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, মন্দিরের কাছে একটি বিলের ধারে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছে দশ হাতে শাঁখা পরেছিলেন স্বয়ং দেবী দুর্গা। ঘটনাটিকে ঘিরে অলৌকিক কাহিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। বিশ্বাসের ধারাবাহিকতায় আজও বংশপরম্পরায় ওই পরিবারের সদস্যরা পূজার সময় এসে দেবীর প্রতিমার হাতে শাঁখা পরিয়ে দেন। এই প্রথাকে ঘিরে স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে বিশেষ ধর্মীয় আবেগ রয়েছে।
মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে নস্কর সাধুর সাধনাস্থল : স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মন্দির প্রাঙ্গণেই আজও রয়েছে নস্কর সাধুর সাধনাস্থল। পূজার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই স্থানকে ঘিরেও মানুষের আগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি, দেবীর নির্দিষ্ট পথ ধরে নিরঞ্জনের প্রথাও এই পূজার ঐতিহ্যের অংশ বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত।
মহাষ্টমীর পুজো ও আরতি দেখতে ভক্তদের ভিড় : প্রতি বছর দুর্গাপূজার সময় এই মন্দিরে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। বিশেষ করে মহাষ্টমীর পুজো এবং আরতি দেখতে বহু মানুষ ভিড় জমান। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা এই প্রাচীন পূজা দেখতে এবং দেবীর আশীর্বাদ নিতে আসেন। পুজো-পাঠ, মানত, আরতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উৎসবের দিনগুলিতে মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয় ধর্মীয় আবহ।
প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে চলে আসছে বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই দুর্গাপূজার সূচনাকাল । তবে স্থানীয় জনশ্রুতি, পারিবারিক প্রথা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূজাটি যে একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করছে, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নদীপথের প্রাচীন যোগাযোগব্যবস্থা, জমিদারি যুগের স্মৃতি, সাধককে ঘিরে লোককথা এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা শাঁখা পরানোর রীতি—সব মিলিয়ে এই দুর্গাপূজা স্থানীয় ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাসের সঙ্গে লোকবিশ্বাসের মেলবন্ধনে আজও বেঁচে রয়েছে এই প্রাচীন দুর্গাপূজার ঐতিহ্য। সময় বদলেছে, বদলেছে সামাজিক পরিস্থিতি; কিন্তু স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও প্রজন্মান্তরে চলে আসা রীতির মধ্য দিয়ে আজও বহমান দেবী আরাধনা।

By admin

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।